Bangladesh Blog (BN)

এসি কেনার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে

Written by লালামুভ বাংলাদেশ | Aug 18, 2024, 7:06:23 AM

দিন দিন গরম বাড়ছে। শীতপ্রধান দেশগুলোও এখন তীব্র দাবদাহে ভুগছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে তাপমাত্রা বেড়েছে। তাই air condition বা এসি কেনার চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বাসার জন্য কোন এসি ভালো, কোন মডেলে বিদ্যুৎ বিল কম হবে, আর কত টনের এসি দরকার হবে—এসব আগে বুঝে নেওয়া জরুরি।

রুমের আকার

সবার আগে রুমের মাপ দেখুন। এসির ওপর বেশি চাপ পড়লে সমস্যা হয়। যেখানে ৩ টনের এসি দরকার, সেখানে ১ টনের এসি বসালে যেকোনো সময় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রুমের আয়তন, রুমের অবস্থান, কতটা রোদ পড়ে, আর সেখানে কতজন থাকবে—এসবও হিসাব করতে হয়।

  • ১০০-১২০ বর্গফুটের রুম: ১ টন
  • ১২০-১৫০ বর্গফুটের রুম: দেড় টন
  • এর চেয়ে বড় রুম: ২ টন

প্রয়োজনের চেয়ে বড় টনের এসি নিলে রুম বেশি ঠান্ডা হয়ে বিদ্যুৎ বিল বাড়ে। আবার ছোট টনের এসি নিলে কম্প্রেসরে চাপ পড়ে। তাই ইলেকট্রিশিয়ানের মাধ্যমে ঘরের বিদ্যুৎ টানার ক্ষমতাও দেখে নিন।

ইনভার্টার

ইনভার্টার এসি নিলে ঘর ঠান্ডা হওয়ার পর কম্প্রেসর ধীরে চলে বা বন্ধ হয়। এতে বিদ্যুৎ খরচ কমে। কম ক্যাপাসিটিতেও এটি কাজ করতে পারে, তাই ব্যবহারও আরামদায়ক।

নন-ইনভার্টার এসিতে ঘর ঠান্ডা হলে কম্প্রেসর বন্ধ হয়। তাপমাত্রা বাড়লে আবার চালু হয়। এভাবে বারবার অন-অফ হলে বিদ্যুৎ বিল তুলনামূলক বেশি আসে।

স্প্লিট এসি, উইন্ডো এসি, পোর্টেবল এসি

স্প্লিট এসির কম্প্রেসর ঘরের বাইরে থাকে, তবে বসাতে দেয়াল ভাঙতে হতে পারে। উইন্ডো এসি বসাতে একটি জানালা বন্ধ করতে হয়। ঘরে অন্য জানালা না থাকলে আলো-বাতাস কমে গুমোট ভাব তৈরি হতে পারে। স্প্লিট এসির ইভাপোরেটর কয়েল রুমের ভেতর ঠান্ডা করে, আর কন্ডেন্সার কয়েল ভেতরের গরম বাতাস বাইরে পাঠায়।

উইন্ডো এসি তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। তাই যাদের বাজেট কম, তারা এটি দেখতে পারেন। সাধারণত বসার ঘর বা অফিসের বড় রুমে স্প্লিট এসি বেশি ব্যবহার হয়। উইন্ডো এসিতে ওয়াটার বা এয়ার-কুলড কন্ডেন্সিং ইউনিট আলাদা থাকে।

পোর্টেবল এসি: এর ফ্লেক্সিবল এগজস্ট পাইপ জানালা বা দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে বাইরে বের করতে হয়। এটি সহজে বহন করা যায় এবং দামও কম।

সেন্ট্রাল এসি: বড় শপিং সেন্টার, হাসপাতাল, অফিসের মতো বাণিজ্যিক জায়গায় এই এসি ব্যবহার হয়।

হাইব্রিড এসি: সোলার প্যানেলের সাহায্যে চলে। এটি পরিবেশবান্ধব, তবে সহজে মেলে না।

উপাদান

ব্লোয়ার ফ্যান এসির বাতাস ছড়িয়ে দেয়। ফ্যান যত বড় হবে, তত বেশি বাতাস পাওয়া যাবে।

কনডেনসার কয়েল ঠান্ডা করার গতি বাড়ায়। এর তাপ আদান-প্রদানের ক্ষমতা ভালো হতে হবে। ক্ষয়রোধী গুণও থাকা দরকার।

ক্যাপাসিটর ও নিরাপত্তা সার্কিট ঠিক থাকলে ঝুঁকি কমে। তাই মান ভালো কি না দেখে নেওয়া জরুরি।

এসির ফিল্টার বাতাসের ময়লা, জীবাণু, ধোঁয়া আর গন্ধ দূর করে। ভালো ফিল্টার ধুলা কয়েলে পৌঁছাতে দেয় না, ফলে এসির কার্যক্ষমতা ভালো থাকে।

এয়ারফ্লো কত, আর ফ্ল্যাপ আছে কি না—এসবও দেখে নিন। ফ্ল্যাপ ম্যানুয়াল বা রিমোট, দুইভাবেই ঠিক করা যায়।

অ্যালুমিনিয়াম এসির দাম কপার এসির চেয়ে একটু কম হতে পারে। কপার তাপ দ্রুত আদান-প্রদান করে, তাই এর কার্যক্ষমতা ভালো হয়। এতে বিদ্যুৎ বিলও কম আসতে পারে।

গ্যাসের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব গ্যাস বেছে নিন। যেমন, R-410A গ্যাস ওজোন স্তরের ক্ষতি করে না।

ব্র্যান্ড

কোনো কিছু কেনার আগে ভালো ব্র্যান্ড দেখা জরুরি। এতে লম্বা সময়ের জন্য বিনিয়োগ করা যায়। এসির মতো পণ্যে ব্র্যান্ড, সার্ভিস, ওয়ারেন্টি আর কাছের সার্ভিস সেন্টার খুবই দরকার। ব্র্যান্ডের রিভিউ দেখুন, বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে নিন, আর পরিচিতদের অভিজ্ঞতাও জেনে নিন। অনলাইনে কিনলে ডেলিভারি ও ইন্সটলেশন চার্জও দেখে নিন।

গ্রি

বাংলাদেশে গ্রি খুব পরিচিত। ১ টন থেকে ৫ টন পর্যন্ত স্প্লিট, উইন্ডো এবং পোর্টেবল এসি পাওয়া যায়। এদের কম্প্রেসারের লাইফ ভালো, তাই দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।

মিডিয়া

মিডিয়া এসিতে শব্দ কম হয়। এতে Wi-Fi, এয়ার পিউরিফায়ার, ডিহিউমিডিফায়ার, স্প্লিট, উইন্ডো, পোর্টেবল, ক্যাসেট ইউনিট এবং ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো সিস্টেমের মতো ফিচার আছে।

জেনারেল

আবাসিক ও বাণিজ্যিক দুই ক্ষেত্রেই এই ব্র্যান্ড পরিচিত। জেনারেল এসিতে হিউম্যান সেন্সর, হট এবং কুল ফাংশন, ভি-পিএএম ইনভার্টার, হাই-ডেনসিটি মাল্টি-পাথ, হিট এক্সচেঞ্জার, আর নেগেটিভ এয়ার আয়নস ডিওডোরাইজিং ফিল্টার আছে।

প্যানাসনিক

প্যানাসনিকও জনপ্রিয়। তাদের এয়ার পিউরিফায়ার ও ডিহিউমিডিফায়ার ফিচার এলার্জি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে এমন মানুষের জন্য উপকারী। ন্যানো এক্স টেকনোলোজি জীবাণু ধ্বংসে সাহায্য করে।

ওয়ালটন

ওয়ালটন বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড। উন্নত প্রযুক্তি আর বাজেটবান্ধব দামের কারণে এটি জনপ্রিয়।

স্যামসাং

স্যামসাং ব্র্যান্ডের এসিতে ডিজিটাল ইনভার্টার টেকনোলোজি, এয়ার পিউরিফিকেশন, ডিহিউমিডিফিকেশন সিস্টেম এবং স্মার্ট এয়ার ফ্লো সিস্টেম পাওয়া যায়।

এলজি

এলজি-ও খুব জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড। তাদের ডুয়াল ইনভার্টার টেকনোলোজি, স্মার্ট কন্ট্রোল, এয়ার পিউরিফায়ার, ডিহিউমিডিফায়ার, অটো ক্লিনিং, স্মার্ট থিংক টেকনোলোজি এবং স্মার্ট ডায়াগনোসিস টেকনোলোজি আছে।

এছাড়া হিটাচি, মিতসুবিসো, শাওমি, শার্প, ভিশন ইত্যাদি ব্র্যান্ডও পাওয়া যায়।

স্টার রেটিং

ব্র্যান্ডের সাথে সাথে ব্যুরো অব এনার্জি এফিসিয়েন্সির স্টার রেটিং দেখুন। এসির গায়ে থাকা স্টিকারেই এই রেটিং থাকে। স্টার যত বেশি, কার্যক্ষমতা তত ভালো। বিদ্যুৎ বিলও কম আসে।

এক স্টার এসি বছরে প্রায় ৮৪৩ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। পাঁচ স্টার এসি বছরে প্রায় ৫৫৪ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তাই কম খরচে চালাতে চাইলে বেশি স্টারের এসি নিন।

দাম

এসির দাম ব্র্যান্ড, টন এবং স্টার রেটিংয়ের ওপর নির্ভর করে। স্টার বেশি হলে দামও সাধারণত বেশি হয়। তাপদাহ বাড়ায় এখন চাহিদা বেশি, তাই দামও অনেক সময় বাড়ে।

  • ওয়ালটন: ইনভার্টার ১ টন ৬২ হাজার ৯০০ টাকা, দেড় টন ৭২ হাজার টাকা, নন-ইনভার্টার ১ টন ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা।
  • ট্রান্সটেক: ইনভার্টার ১ টন ৫৯ হাজার ৭০৮ টাকা, দেড় টন ৭৯ হাজার ৯৪৮ টাকা, ২ টন ৯৩ হাজার ২৮৮ টাকা।
  • মিনিস্টার: ১.৫ টন ইনভার্টার ৭২ হাজার ৯০০ টাকা, ২ টন ইনভার্টার ৮০ হাজার ৯০০ টাকা।
  • যমুনা: ১ টন ৪৫ হাজার ৭২০ টাকা, দেড় টন ৬৫ হাজার ৫২০ টাকা, ২ টন ৭৮ হাজার ১২০ টাকা।
  • ভিশন: ১ টন ৩৯ হাজার ৫১০ টাকা, দেড় টন ৫৯ হাজার ৩১০ টাকা, ২ টন ৭৩ হাজার ৭১০ টাকা।
  • মিডিয়া: ১ টন ৪৩ হাজার টাকা, দেড় টন ৫৯ হাজার টাকা, ২ টন ৬৮ হাজার টাকা।
  • স্যামসাং: ইনভার্টার ১ টন ৭৩ হাজার ৯০০ টাকা, দেড় টন ৯৫ হাজার ৯০০ টাকা, ২ টন প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯০০ টাকা।
  • ওয়ার্লপুল: ইনভার্টার ১ টন ৭৫ হাজার ৬৩০ টাকা, দেড় টন ৯৪ হাজার ৭৪৩ টাকা।
  • হিটাচি: দেড় টন ইনভার্টার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০ টাকা, ২ টন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫০ টাকা।
  • জেনারেল: ইনভার্টার ১ টন ৮১ হাজার ৪০০ টাকা, দেড় টন ১ লাখ ১৫ হাজার ৯০০ টাকা।

এসির দাম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। তাই কেনার আগে নতুন দাম আবার দেখে নিন।

এসির যত্ন

  • একটানা অনেকক্ষণ এসি না চালিয়ে মাঝে মাঝে বিরতি দিন।
  • বাইরের অংশে বাতাস চলাচলের জায়গা খোলা রাখুন।
  • বছরে অন্তত দুইবার ফিল্টার পরিষ্কার করুন এবং কম্প্রেসর চেক করুন।
  • বেশি ব্যবহার হলে ৬ মাসে একবার, কম ব্যবহার হলে বছরে একবার সার্ভিসিং করান।
  • তাপমাত্রা ২৫ বা তার বেশি রাখলে বিদ্যুৎ বিল কমে।
  • বারবার অন-অফ না করে টাইমার, টার্বো কুলিং মুড বা স্লিপিং মুড ব্যবহার করুন।

উপসংহার

এসি এখন প্রয়োজনের অংশ হয়ে গেছে। তবে এতে খরচ, নিরাপত্তা আর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার—সবই আছে। তাই রুমের আকার, বাজেট, ব্র্যান্ড, স্টার রেটিং আর সার্ভিস দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নিন। বাসার জন্য কোন এসি ভালো, তা বুঝতে এই গাইড কাজে লাগবে বলে আশা করি।

এসি পরিবহনে পিকআপ দরকার হলে লালামুভ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।

Q&A

Question: রুমের জন্য কত টনের এসি কিনতে হবে কীভাবে বুঝব?

Short answer: রুমের আয়তন দেখে টন ঠিক করুন। সাধারণভাবে ১০০-১২০ বর্গফুটের রুমে ১ টন, ১২০-১৫০ বর্গফুটের রুমে দেড় টন, আর বড় রুমে ২ টন লাগতে পারে। রুমে রোদ কতটা পড়ে, কতজন থাকবে, আর বাড়ির বিদ্যুৎ টানার ক্ষমতা আছে কি না—এসবও দেখুন।

Question: ইনভার্টার এসি কেন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হতে পারে?

Short answer: ইনভার্টার এসিতে ঘর ঠান্ডা হলে কম্প্রেসর ধীরে চলে বা বন্ধ হয়। তাই বিদ্যুৎ কম লাগে। নন-ইনভার্টার এসিতে কম্প্রেসর বারবার অন-অফ হয়, ফলে বিদ্যুৎ বিল বেশি হতে পারে।

Question: স্প্লিট এসি ও উইন্ডো এসির মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া উচিত?

Short answer: এটা ঘরের কাঠামো, বাজেট এবং ব্যবহারের সুবিধার ওপর নির্ভর করে। স্প্লিট এসিতে বেশি ফিচার পাওয়া যায়, তবে দেয়াল ভাঙতে হতে পারে। উইন্ডো এসি কম দামে পাওয়া যায়, কিন্তু একটি জানালা বন্ধ করতে হয়।

Question: এসি কেনার সময় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি আর কী কী বিষয় দেখা জরুরি?

Short answer: স্টার রেটিং, সার্ভিস সেন্টারের অবস্থান, ওয়ারেন্টি, সার্ভিস অফার, অনলাইন ডেলিভারি, ইন্সটলেশন চার্জ, ফিল্টার, কনডেনসার কয়েল, এয়ারফ্লো, ফ্ল্যাপস এবং পরিবেশবান্ধব গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে কি না—এসবও দেখে নিন।

Question: এসি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে কী ধরনের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন?

Short answer: একটানা অনেকক্ষণ চালাবেন না। বাইরে বাতাস চলাচল রাখুন, বছরে দুবার ফিল্টার পরিষ্কার করুন, আর প্রয়োজন হলে সার্ভিসিং করান। বিদ্যুৎ বিল কমাতে তাপমাত্রা ২৫ বা তার বেশি রাখুন এবং টাইমার, টার্বো কুলিং মুড বা স্লিপিং মুড ব্যবহার করুন.